সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

কাঁকড়া চাষ

বাংলাদেশে প্রায় ২০ প্রজাতির কাঁকড়া পাওয়া যায়৷ এর মধ্যে জাতি কাঁকড়ার বিস্তৃতি সবচেয়ে লক্ষ্যণীয়৷ এটি যেমন সুস্বাদু তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমান ও চাহিদা সম্পন্ন৷ আমাদের দেশে কাঁকড়া চাষ এখনো গবেষণা পর্যায়েই রয়ে গেছে৷ শুধুমাত্র উপকূলীয় এলাকার নদীসমূহ, ম্যানগ্রোভ এবং সমুদ্র এলাকা থেকে কাঁকড়া ধরা হয় এবং বাজারজাত করা হয়৷ এ সময়ে প্রচুর পরিমানে অপরিপক্ক এবং নরম কাঁকড়া ধরা
পড়ে যার কোন বাজার চাহিদা নেই৷ এসকল অপরিপক্ক কিংবা নরম কাঁকড়াকে ২-৪ সপ্তাহ ঘেরে রেখে বাজারে বিক্রির উপযুক্ত আকারে পরিণত করাকে মোটাতাজাকরণ বা ফ্যাটেনিং বলে৷ নিন্মলিখিত পদ্ধতিতে কাঁকড়া মোটাতাজাকরণ বা ফ্যাটেনিং করা হয়-
কাঁকড়া মোটাতাজাকরণে পুকুর প্রস্তুতি
  • কাঁকড়া মোটাতাজাকরণের জন্য দো-আঁশ বা পলি দো-আঁশ মাটির পুকুর সবচেয়ে উপযুক্ত
  • পুকুরের সমস্ত আগাছা পরিস্কার করতে হবে এবং পুকুর ভালোভাবে শুকাতে হবে
  • পুকুর শুকানোর পর পাড় ভালোভাবে মেরামত করতে হবে যেন পানি চুঁইয়ে না যায় এবং কাঁকড়া গর্ত করে বের না হতে পারে
  • এছাড়াও পুকুরের চারিপাশ ১.০ মিটার উঁচু বাঁশের বানা বা পাটা দিয়ে ভালোভাবে ঘিরে দিতে হবে যাতে কাঁকড়া পুকুর থেকে বের হয়ে যেতে না পারে
  • কাঁকড়া খোলস ছাড়ার সময় যাতে আশ্রয় নিতে পারে সেজন্য পুকুরের তলায় ছোট ছোট মাটির পাত্র কিংবা সিমেন্টের পাইপ স্থাপন করতে হবে
  • মাটির পিএইচ এর উপর ভিত্তি করে চুন প্রয়োগ করতে হবে৷ সাধারণত শতাংশ প্রতি ১ কেজি হারে চুন প্রয়োগ করা যায়
  • চুন প্রয়োগের ৭ দিন পর পুকুরে জোয়ারের পানি ঢুকাতে হবে
  • পানি ঢুকানোর ৭ দিন পর শতাংশ প্রতি ৩ কেজি হারে গোবর সার প্রয়োগ করতে হবে
  • এর ৩ দিন পর শতাংশ প্রতি ১০০ গ্রাম ইউরিয়া, ৬০ গ্রাম টিএসপি সার প্রয়োগ করতে হবে
  • সার প্রয়োগের পাশিপাশি ক্রমান্ময়ে পুকুরে পানির গভীরতা বাড়িয়ে ১ মিটার পর্যন্ত রাখতে হবে # এর ৩-৪ দিন পর পুকুরে কাঁকড়া মজুদ করা যায়
  • প্রয়োজনবোধে প্রতি অমাবশ্যা বা পূর্ণিমার গোণে পুকুরের ২৫-৩০ ভাগ পানি পরিবর্তন করা যেতে পারে
পানির গুণাগুণ
কাঁকড়া মোটাতাজাকরণের জন্য পানির নিম্নলিখিত গুণাগুণ মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি
পানির প্রয়োজনীয় গুণাগুণ
 পরিমাপক মাত্রা
  পিএইচ  ৭.৫-৮.৫
 তাপমাত্রা  ২৫-৩২০ সে
 দ্রবীভূত অক্সিজেন  ৪ পিপিএম এর বেশী
 লবণাক্ততা  ১০-২৫ পিপিটি
  ঘোলাত্ব ০
 খরতা  ৪০-১০০ পিপিএ
  কাঁকড়ার মজুদ ঘনত্ব
  • কাঁকড়া মোটাতাজাকরণের জন্য ১৭০ গ্রাম বা তার বেশি ওজনের অপরিপক্ক স্ত্রী কাঁকড়া যেগুলোর গোনাড (ঘিলু নামে পরিচিত) কম বা হয়নি সেধরনের কাঁকড়া মজুদ করতে হয়
  • পুরুষ কাঁকড়ার ক্ষেত্রে ৪০০ গ্রাম ওজনের বেশি নরম কাঁকড়া পুকুরে মজুদ করা লাভজনক
  • পুরুষ কাঁকড়া, স্ত্রী কাঁকড়ার চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয় সেজন্য পুরুষ ও স্ত্রী কাঁকড়া আলাদা পুকুরে মজুদ করা ভালো
  • শতাংশ প্রতি ৪০ টি করে কাঁকড়া মজুদ করা যায়
খাদ্য প্রয়োগ
  • কাঁকড়া মোটাতাজাকরণে খাদ্য হিসাবে তেলাপিয়া মাছ, গরু-ছাগলের ভুঁড়ি, চিংড়ির মাথা, শামুক-ঝিনুকের মাংশ ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়
  • দৈনিক ২৫ ভাগ তেলাপিয়া মাছ এবং ৭৫ ভাগ গরু-ছাগলের ভুঁড়ি কিংবা ৫০ ভাগ তেলাপিয়া মাছ এবং ৫০ ভাগ চিংড়ির মাথা বা শামুক-ঝিনুকের মাংশ খাদ্য হিসাবে সরবরাহ করা এযতে পারে
  • দৈনিক কাঁকড়ার দেহের ওজনের ৮-৫ ভাগ হারে খাদ্য প্রয়োগ করতে হবে
  • কাঁকড়া নিশাচর প্রাণী তাই দৈনিক বিকালে বা সন্ধ্যায় এবং রাতে মোট ২ বার খাদ্য দেয়া ভালো
পরিপক্কতা পরীক্ষা
  • পুকুরে কাঁকড়া মজুদের মোটামোটি ১০ দিন পর থেকেই স্ত্রী কাঁকড়ার গোনাড (ঘিলু নামে পরিচিত) পরিপক্ক হয়েছে কিনা তা পরীক্ষা করতে হবে
  • একই সময় থেকে পুরুষ কাঁকড়ার শক্ত হয়েছে কিনা তা পরীক্ষা করতে হবে
আহরণ ও বাজারজাতকরণ
  • স্ত্রী কাঁকড়ার গোনাড পরিপুষ্ঠ এবং পুরুষ কাঁকড়ার খোসা শক্ত হলে তা ধরে বাজারে বিক্রির ব্যবস্থা নিতে হবে
  • সরাসির হাত দিয়ে বা স্কুপনেট দিয়ে কিংবা টোপ ফেলে কাঁকড়া ধরা হয়
  • কাঁকড়া পুকুর থেকে ধরার সাথেসাথেই কাঁকড়া বাঁধার বিশেষ দড়ি দিয়ে ভালোভাবে বেঁধে ফেলতে হবে যাতে একে অপরের সাথে মারামারি করে উপাঙ্গসমূহ (বিশেষ করে পা) ভেঙ্গে না যায়
  • কারন এরকম হাত-পা ভাঙ্গা কাঁকড়ার বাজার চাহিদা কমে যায়
জাতি কাঁকড়া
 পর্ব : Arthropoda (আর্থেপোডা)  চিত্রসূত্র: দীপক কামাল, অধ্যাপক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়
  শ্রেণী : Crustacea (ক্রাস্টেসিয়া)
 বর্গ : Decapoda (ডেকাপোডা)
 গোত্র : Portunidae (পরচুনিডি)
  গণ : Scylla (স্যাইলা)
  প্রজাতি :  Scylla serrata (স্যাইলা সেরাটা)
 স্থানীয় নাম : জাতি কাঁকড়া, সীলা কাঁকড়া
 আর্ন্তজাতিক নামমাড ক্রাব
 সনাক্তকরণ বৈশিষ্ট্য :োলস আড়াআড়িভাবে ডিম্বাকৃতির এবং প্রস্থ দৈর্ঘ্যের তুলনায় অনেক বেশি৷ খোলস মসৃণ এবং সম্মুখ অংশ বেশ প্রশস্ত৷ খোলস সামনের দিকে উত্তল এবং নয়টি সমআকৃতির খাঁজ আছে৷ এর কারপাস ও প্রপোডাস বেশ চওড়া যা সাঁতার কাটতে সহায়তা করে৷ কারপাসে ২টি কাঁটা আছে যার একটি নিচের দিকে অপরটি উপরের দিকে৷ প্রপোডাস লম্বাকৃতির ও ৩টি কাঁটা আছে, যার একটি নিচে ও বাকি ২টি শীর্ষভাগে অবস্থিত৷
  বিস্তার : বাংলাদেশ ছাড়া ভারত, আন্দামান, নিকোবর, ফিলিপাইন, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, আফ্রিকা ও পারস্য উপসাগরে পাওয়া যায়
 আবাসস্থল ও অভ্যন্তরীন বিচরণ :  বছরের সবসময়ই বঙ্গোপসাগরে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়৷ অগভীর সমুদ্র, মোহনায় এবং ম্যানগ্রোভ এলাকায় এদের প্রচুর পরিমণে পাওয়া যায়
 খাদ্য ও খাদ্যাভাস : সাধারণত এরা বিভিন্ন প্রকৃতির মাছ, শামুক-ঝিনুক, প্লাঙ্কটন, কাদা, বালি ইত্যাদি খেয়ে থাকে৷ এমনকি এরা স্বজাতি প্রাণীকেও খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে৷
 পুষ্টিগুণ :কাঁকড়াতে ১২.৬৫ ভাগ আমিষ, ৫.১০ ভাগ শর্করা, ৩.৯৯ ভাগ চর্বি, ৯.৮৭ ভাগ এ্যাস ও ৬৮.৩৩ ভাগ পানি থাকে৷ তবে কাঁকড়ার ডিমে ২৮.৭২ ভাগ আমিষ ও ১২.১৪ ভাগ শর্করা পাওয়া গেছে
 প্রজনন : এরা সাধারণত এক বছরের মধ্যেই প্রজনন কর
 ডিম ছাড়ার স্থান : সাধারণত অগভীর সমুদ্রে ডিম ছাড়ে
 ডিম ধারণ ক্ষমত  –
 বয়স ও বৃদ্ধি : সর্বোচ্চ ১.০-১.৫ কেজি ওজন হয় পারে বলে জানা গেছে
 সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য : কাঁকড়া সর্বোচ্চ ২১১ মিমি পর্যন্ত লম্বা হতে পারে
 মাছ ধরার উপকরণ : কাঁকড়া ধরার জন্য তোপ, থোপা, দোনদড়ি, খাঁচা, আয়রন হুক ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়৷ তবে নদী বা সমুদ্রে মাছ ধরার কাজে ব্যবহৃত বেহুন্দি জাল, ইলিশ ধরার কাজে ব্যবহৃত কাঠি জালে এরা প্রচুর পরিমাণে ধরা পড়ে
 গুরুত এরা প্রতিকূল পরিবেশে পানি ছাড়াই ৮-১০ দিন অনায়াসেই বেঁচে থাকতে পারে৷ আমাদের দেশীয় বাজারে তেমন চাহিদা নেই তবে বিদেশে এ জাতের কাঁকড়ার প্রচুর চাহিদা আছে যা তারা খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে৷ বর্তমানে কাঁকড়া রপ্তানি করে আমাদের দেশ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে৷ পৃথিবীর বহু দেশেই দুরারোগ্য ব্যাধি চিকিত্‍সার জন্য কাঁকড়ার যথেষ্ট ব্যবহার রয়েছে
স্বল্প পুঁজিতে কাঁকড়া চাষ বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল ও প্লাবন (মেনগ্রোভ) সংলগ্ন এলাকা কাঁকড়া চাষের জন্য উপযোগী। আলোচ্য পদ্ধতিতে বাঁশের বন্ধ খাঁচাতে কাঁকড়ার পরিচর্যা বা খাবার দেয়ার কাজটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। মলটিন বা খোলস বদলানোর সময় একে অন্যকে খাওয়ার প্রবণতা থাকে না বলে বাঁচার হার বেড়ে যায়। এ পদ্ধতিতে নদী বা মোহনায় খাঁচা বসিয়ে কাঁকড়া পালন করা হয় বলে কাঁকড়া প্রাকৃতিক পরিবেশেই তাড়াতাড়ি বেড়ে ওঠে। এ নিয়ে লিখেছেন বকুল হাসান খানভাসমান বাঁশের খাঁচায় কাঁকড়া পালন। বিদেশি দাতাসংস্থা ডি এফ আই ডি এর সুপার সাপোর্ট ফর ফিসারিজ এডুকেশন অ্যান্ড রিচার্স প্রকল্পের আর্থিক সহযোগিতায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক বিজ্ঞান ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ জাফর গত বছরের গোড়ার দিকে কক্সবাজারের চকরিয়া, সুন্দরবন, রামপালের ভাগাই এবং সাতক্ষীরায় মুন্সীগঞ্জের উপকূলীয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের মাধ্যমে কাঁকড়া চাষের সম্ভাব্যতা পরীক্ষণ নামে এক গবেষণা কার্যক্রম শুরু করেছিলেন। ভাসমান বাঁশের খাঁচায় কাঁকড়া পালন তার সেই গবেষণা কার্যক্রমে সাফল্য মিলেছিল সাংঘাতিক। সেখানকার গরিব চাষীদের ও ভাগ্যের দুয়ার গিয়েছিল খুলে। জীবন নকশায় আজ জানা যাক, সেসব প্রযুক্তির বিষয়_ কাঁকড়া চাষ : বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল ও প্লাবন (মেনগ্রোভ) সংলগ্ন এলাকা কাঁকড়া চাষের জন্য উপযোগী। আলোচ্য পদ্ধতিতে বাঁশের বন্ধ খাঁচাতে কাঁকড়ার পরিচর্যা বা খাবার দেয়ার কাজটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। মলটিন বা খোলস বদলানোর সময় একে অন্যকে খাওয়ার প্রবণতা থাকে না বলে বাঁচার হার বেড়ে যায়। এ পদ্ধতিতে নদী বা মোহনায় খাঁচা বসিয়ে কাঁকড়া পালন করা হয় বলে কাঁকড়া প্রাকৃতিক পরিবেশেই তাড়াতাড়ি বেড়ে ওঠে। যেভাবে খাঁচা তৈরি করবেন : প্রথমেই লাগবে বাঁশ। সঙ্গে লাগবে প্লাস্টিক ড্রাম আর সুতা। খাঁচার আয়তন অনুযায়ী এক বা ১.৫ সে. মি. মোটা করে ফালি করতে হবে বাঁশ। এরপর এগুলোকে শক্ত চিকন সুতা দিয়ে পাশাপাশি গেঁথে বানা তৈরি করতে হবে। বানাগুলোকে এবার খাঁচার আকৃতি (দৈর্ঘ ী প্রস্থ ী উচ্চতা) বুঝে পাশাপাশি সংযুক্ত করে বানাতে হবে খাঁচা। খাঁচাটা (৭ ী ৩ ী ১) ফুট আকৃতির হলেই সবচেয়ে ভালো হয়। এতে থাকবে ৬০টি প্রকোষ্ঠ। প্রত্যেক প্রকোষ্ঠের আয়তন (৭ী৭ী১০ ) ইঞ্চি করে হবে। ওপরের ঢাকনাটাও এমন বাঁধতে হবে যেন খাবার দেয়া পরিচর্যা আর স্থানান্তর সুবিধা হয়। পানিতে খাঁচা বসানো : পানিতে খাঁচা বসানোর ক্ষেত্রে জোয়ার-ভাটা ভালো মতো হয় এ রকম চ্যানেল বা মোহনায় লোনা পানির বাছতে হবে। খাঁচাটাও বসাতে হবে এমন করে যেন ভাটার সময় নদীর তলায় লেগে না যায়। খাঁচার ওপরের চার কোণায় চারটি প্লাস্টিকের ছোট ড্রাম বেঁধে দিতে হবে। যাতে এক/দেড় ইঞ্চি ভাসিয়ে রাখতে পারে খাঁচাটাকে। নদীর তলদেশে শক্ত খুঁটি পুঁতে তার সঙ্গে সর্বোচ্চ জোয়ারের উচ্চতা মাথায় রেখে খাঁচাটাকে বেঁধে দিতে হবে। মজবুত রশি দিয়ে। তাতে জোয়ার-ভাটায় ওঠা-নামা করবে খাঁচাটা। কাঁকড়া মজুদ : ১৮০/২০০ গ্রাম ওজনের নরম খোলস আর গোরাল অপরিপক্ব এমন কাঁকড়াই মজুদ করতে হবে। কাজটা অভিজ্ঞ চাষীর পরামর্শ নিয়ে করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। বছরের যে কোনো সময়ে কাঁকড়া মজুদ করা যায়, তবে বর্ষাকালটাই সবচেয়ে ভালো। আহত বা পা নেই এমন কাঁকড়া মজুদ করাটা ঠিক হবে না। খাবারই একমাত্র পরিচর্যা : রোজ সকাল আর বিকালে কাঁকড়া দেহের ওজনের ৫ ভাগ পরিমাণ খাবার দিতে হবে। কুইচ্যা (ইলমাছ) তেলাপিয়া, ছোট মাছ, হাঙ্গরের মাংস, চিংড়ির মাথা ছোট ছোট টুকরা করে দেয়া যেতে পারে খাঁচার এক একটি প্রকোষ্ঠে। এ খাবার দেয়া ছাড়া বাড়তি কোনো পরিচর্যার দরকার নেই কাঁকড়ার। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে দুই বা তিন সপ্তাহের মধ্যেই কাকড়াগুলো বাজারজাত করা উপযোগী হয়ে যাবে। পুরো খাঁচা তুলে এনে চিমটা দিয়ে কাঁকড়া ধরতে হবে। খুব সাবধানে। কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নষ্ট হয়ে গেলে এর কিন্তু দাম কম বাজারে। ধরার সঙ্গে সঙ্গে পা বেঁধে ফেলতে হবে রশি দিয়ে। এ পদ্ধতির সুবিধা : ভাসমান বাঁশের খাঁচায় কাঁকড়া পালন সহজ, কম ঝুঁকিপূর্ণ, স্থানান্তর যোগ্য, পরিবেশ অনুকূল আর লাভজনকও। তেমন বিনিয়োগ করতে হয় না বলে বিনা পুঁজিতেই অনেক লাভ করতে পারেন গরিব কৃষকরা। আরো সুবিধা হচ্ছে_ কাঁকড়ার মৃত্যুর হারও এখানে কম, রোগ সংক্রমনের ভয়ও নেই। আবার মাটি ও পানিও দূষিত হয় না। তাছাড়া অল্প জায়গায় অনেক বেশি কাঁকড়াও পালন করা যায়। খরচাপাতি : ভাসমান বাঁশের খাঁচায় কাঁকড়া চাষ করেছিলেন যে চাষীরা, তাদের কাছ থেকেই জানা গেল বাঁশের খাঁচা, বাঁশ, সুতা, কাঠ, প্লাস্টিক ড্রাম কেনা বাবদ ১৫০০ টাকা এবং শ্রম মূল্য ১৫০০ টাকা করে ৩০০০ টাকা খরচ হবে প্রথমে এবং একবারই। এরপর প্রতিবার কাঁকড়া পালনে খরচটা হবে এভাবে; ১ কেজি ২০০ গ্রাম কাঁকড়ার দাম ২৫ টাকা হিসেবে ৬০টি বা ১১ কেজি কাঁকড়া কিনতে খরচ হবে ২৭৫ টাকা। ১৫ দিনের খাবার খরচ ২০০ টাকা, আর ১৫ দিনে মোট ৩০ ঘণ্টার শ্রমিক খরচ ৪০০ টাকা। ১ বছরে ২০ বার এক খাঁচায় চাষ করা যাবে, এজন্য প্রতি মাসে কাঁকড়া পালনের জন্য খাঁচা বাবদ খরচ ১৫০ টাকা। অতএব প্রতিবার কাঁকড়া পালনে মোট বিনিয়োগ খরচ ১০২৫ টাকা। ১৫ দিন পালনের পর ১৮০ বা ২০০ গ্রাম ওজনের এক একটি কাঁকড়ার ওজন হবে প্রায় ২৫০ গ্রাম এবং গড়ে ৫০টি কাঁকড়া বেঁচে থাকবে। এতে মোট ওজন হবে (২৫০ ী ৫২=১২৫০০) গ্রাম বা ১২.৫ কেজি। এক কেজি কাঁকড়ার বিক্রয় মূল্য ২০০ টাকা হলে মোট আয় হবে। (২০০ ী ১২.৫=২৫০০) টাকা। অর্থাৎ ১৫ দিনে আসলে লাভ হচ্ছে (২৫০০-১০২৫=১৪৭৫) টাকা। প্রতি দুই মাসে একটা খাঁচা থেকে কমপক্ষে তিনটি ফলনে আয় হবে। (১৪৭৫ ী ৩=৪৪২৫) টাকা। একসঙ্গে সাধারণত চারটা খাঁচায় কাঁকড়া পালন করা হয়। সে ক্ষেত্রে দুই মাসে আয় হবে। (৪৪২৫ ী ৪=১৭৭০০) মাসিক আয় সে ক্ষেত্রে দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৯০০০ হাজার টাকার মতো। অনুকূল পরিবেশ, সহজলভ্যতা, স্থানীয় ও বিদেশি বাজারে চাহিদা, উচ্চ পুষ্টিগুণ, স্বল্পমূল্যের খাদ্যপ্রাপ্তি, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আগ্রহ এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা মেলে বাংলাদেশের কাঁকড়ার চাষের বিরাট ক্ষেত্র রয়েছে জানালেন গবেষকরা।
আমাদের দেশে এক সময় প্রচুর পরিমাণে ছোট মাছ পাওয়া যেত। প্রাকৃতিক আশ্রমগুলো নষ্ট ও সংকুচিত হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি কীটনাশক ব্যবহারের ফলে এই সব ছোট মাছের প্রজনন হ্রাস পেয়ে অনেক মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
মাছের প্রয়োজনীয়তার কারণে আশির দশকে গড়ে উঠেছিল গুটি কয়েক কার্প জাতীয় মাছের হ্যাচারি। এসব হ্যাচারির লাভ দেখে রাতারাতি আমাদের দেশে প্রায় ৮০০ এর মত হ্যাচারি গড়ে ওঠে। ৯০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে পাঙ্গাসের চাষাবাদ শুরু হয়। বর্তমান সময়ে দেশীয় কার্প জাতীয় মাছ ও পাঙ্গাসের মোট উৎপাদন প্রায় স্থিতিশীল পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু আমাদের চাহিদার বিপরীতে এখনও ঘাটতি রয়েছে প্রায় ৭ লক্ষ মেট্টিক টনের মত। আর এই ঘাটতি পূরণের জন্য দরকার আধুনিক পদ্ধতির চাষাবাদ এবং উন্নতমানের পোনা। উন্নতমানের পোনা বলতে শুধু অন্ত:প্রজননমুক্ত পোনা হলেই চলবে না। প্রয়োজন বায়োটেক ফিস বা জন্মগতভাবে উন্নতজাতের মাছের পোনা। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে কিছু মাছের বায়োটেকনোলজির কথা উল্লেখ করছি।
আমাদের দেশীয় রুই মাছ প্রথম বছরে খুব একটা বড় হয় না। যার কারণে খামারিরা এক বছর বয়সী রুই মাছের পোনা দিয়ে চাষাবাদ শুরু করেন। কিন্তু এই রুই মাছকে যদি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে ট্রিপ্লয়েড করা হয় তাহলে কমপক্ষে এর বৃদ্ধি হবে প্রায় দেড়গুণ। রুই মাছের ট্রিপ্লয়েড পোনা করাও খুবই সহজ।
প্রথমে স্ত্রী মাছের পেট থেকে চাপ প্রয়োগ পদ্ধতিতে ডিম সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত স্পার্ম মেশানোর পর নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ডিমগুলোকে রেখে দিলেই ট্রিপ্লয়েড রেনু পাওয়া যাবে। অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে ঊল্লেখিত পদ্ধতিতে সব পোনাই ট্রিপ্লয়েড হয় না। আর সে জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় পার হলে কোনটা ট্রিপ্লয়েড আর কোনটা ডিপ্লয়েড পোনা তা সহজেই সনাক্ত করা যায়। আর সনাক্তের কাজ শেষ করতে পারলে প্রথম বছরের ট্রিপ্লয়েড পোনা দিয়েই এক বছরে কমপক্ষে ১ কেজি ওজনের রুই উৎপাদন করা সম্ভব।
জন্মগতভাবে উন্নত দেশি শিং, কৈ, পাবদা, পুটি, পাঙ্গাস ইত্যাদি সাধারণভাবে উৎপাদিত মাছের মধ্যে অর্ধেক মাছ পুরুষ আর অর্ধেক মাছ স্ত্রী। এসব মাছের মধ্যে কিছু পুরুষ ও স্ত্রী মাছ বড় হয়। যে সমস্ত স্ত্রী মাছ বড় হয় তার মধ্যে শিং, কৈ, পাবদা, পুটি, পাঙ্গাস মাছ রয়েছে। আবার কিছু পুরুষ মাছ বড় হয় যেমন- তেলাপিয়া, দেশি মাগুর ইত্যাদি। যে মাছগুলো এক বছরে বা তারও কম সময়ে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে থাকে সে সমস্ত মাছকে সহজেই বায়োটেকনোলজি প্রয়োগ করে স্ত্রী মাছে রূপান্তরিত করা সম্ভব। তিন বছরের মধ্যেই জন্মগতভাবে উন্নত স্ত্রী কৈ মাছ উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। একই পদ্ধতি অনুসরণ করে শিং, পাবদা, পুটি, পাঙ্গাস মাছের স্ত্রী মাছ উৎপাদন করা সম্ভব।
স্ত্রী মাছ উৎপাদন করার কৌশল সাধারণভাবে কৈ, শিং, পাবদা, পুটি, পাঙ্গাসকে প্রজনন করিয়ে রেনু উৎপাদন করার পর খাদ্য গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে ১৭ আলফা মিথাইল টেস্টোস্টেরন হরমোন প্রয়োগ করে মাছগুলোকে পুরুষ মাছে রূপান্তরিত করতে হবে।
এই মাছগুলো প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পর থেকে একটি করে পুরুষ মাছ প্রজননে ব্যবহার করতে হবে এবং অই পুরুষ মাছটিকে আলাদা করে রাখতে হবে। পরবর্তীতে বাচ্চা বড় হওয়ার পর বাচ্চাগুলোকে সেক্সিং টেস্ট করে যদি সব স্ত্রী মাছ পাওয়া যায় তাহলে এই মাছের প্রজননে ব্যবহৃত পুরুষ মাছটিই হল সুপার পুরুষ এবং এই পুরুষ মাছের সাথে যেকোন স্ত্রী মাছের প্রজনন করালেই জন্মগতভাবে উন্নত সব স্ত্রী মাছ পাওয়া যাবে। এভাবে বারবার পরীক্ষা করে সুপার পুরুষ মাছ সংগ্রহ করতে হবে।
এই প্রক্রিয়া ব্যবহার করে থাই কৈ মাছের সব স্ত্রী মাছ উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। এই প্রক্রিয়াটি ব্যবহার করে শিং, পুটি সব স্ত্রী মাছের উৎপাদনের প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আশা করছি এই গবেষণাটি শেষ হলে এর যাবতীয় তথ্যাদি সাধারণ খামারির মাঝে উন্মুক্ত করার ইচ্ছা আছে। জন্মগতভাবে উন্নত এই মাছ সাধারণ মাছের চেয়ে কমপক্ষে ৭০% অতিরিক্ত উৎপাদন হয় (থাই কৈ)।
এক পরীক্ষায় দেখা গেছে, সাধারণভাবে উৎপাদিত স্ত্রী মাছের চেয়ে এ মাছের শতকরা ২০ ভাগ ওজনে বেশি হয়ে থাকে। একই প্রক্রিয়ায় পাঙ্গাস মাছের স্ত্রী মাছ উৎপাদন করতে পারলে দেশে পাঙ্গাস মাছের উৎপাদনে বিশাল আকারে বেড়ে যাবে। যদিও প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে ৪/৫ বছরের বেশি সময় লাগতে পারে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে দেশের প্রোটিন চাহিদা পূরণে সামনের দিনে বায়োটেক ফিসের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

Siam Ahmed Full Biography, Age, Height, Weight, Wife & Pictures

Travel Tax And Port Fee | ভ্রমণ কর ও পোর্ট ফি দিতে হয় | India Travel

  Travel Tax And Port Fee | ভ্রমণ কর ও পোর্ট ফি দিতে হয় | India Travel highlights ইন্ডিয়া ভ্রমণ ট্যাক্স কত টাকা বেনাপোল পোর্ট ফি কত বাংলাদেশ ভ্রমণ ট্যাক্স কত বাংলাদেশে ভ্রমণ কর গ্রহণ করে কোন ব্যাংক ট্রাভেল ট্যাক্স কি #Travel_tax #port_fee #India_travel ট্রাভেল ট্যাক্স,পোর্ট ফি,বেনাপোল পোর্ট,indian travel tax,port fee,ভ্রমণ কর

চা কপি বানিয়ে ভাইরাল হওয়া সেই ব্যক্তি | শূন্য থেকে চা কপি বিক্রি থেকে সফ...

নগদ নয় টাকায় ক্যাশ আউট | কিভাবে সম্ভব | Nagod 9 taka cashout

 

ভারতে চিকিৎসার জন্য কোথায় যাবেন কেন যাবেন || চেন্নাই এপোলো নাকি ভেলোর স...