SLIDER

Navigation-Menus (Do Not Edit Here!)

কোকাকোলায় কোকেন

বিশ্বে সর্বাধিক জনপ্রিয় পানীয়ের নাম কোকাকোলা। উন্নত দেশ থেকে শুরু করে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে পর্যন্ত আর কিছু পাওয়া যাক বা না যাক কোকাকোলা পাওয়া যায়। এমনকি আরব দেশগুলোতেও কোকাকোলা ব্যাপক সমাদৃত। আর বিশ্বব্যাপী কোকাকোলা ছড়িয়ে যেতে অনেকটা সময় পাড়ি দিতে হয়েছে এর উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে। মূলত ১৯ শতকের শুরুর দিকে এই পানীয় উৎপাদন শুরু হয়। তবে এই পানীয় উৎপাদনের পেছনে আছে বেশকিছু ঘটনার সম্মিলন।
ফরাসি গৃহযুদ্ধের এক পর্যায়ে বেশ ভয়ানক আহত হলেন কর্ণেল জন পেমবারটন। চিকিৎসার কারণে প্রাণে বেঁচে গেলেও ব্যথা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তিনি মরফিনে আসক্ত হয়ে যান। সেসময় অনেক যুদ্ধাহতই ব্যথা নিবারণী হিসেবে মরফিন নিতেন এবং একটা সময় নেশাগ্রস্ত হয়ে যেতেন। তখন পেমবারটনের ঈগল ড্রাগ অ্যান্ড কেমিক্যাল হাউস ‘কোকা-কোলা রেসিপি’ তৈরি করেন। যাকে তখন বলা হতো কোকা ওয়াইন। ১৮৮৫ সালের দিকে পেমবারটন ‘ফ্রেঞ্চ ওয়াইন কোকা’ নামে ওই পানীয়টির পেটেন্ট গ্রহন করেন। পরবর্তী বছর অর্থাৎ ১৮৮৬ সালের ৮ মে জর্জিয়া জ্যাকব ফার্মাসির কাছে ওই ওয়াইনের একটি চালান বিক্রি করে পেমবারটন কোম্পানি। তখন এক বোতল কোকা ওয়াইনের দাম রাখা হয়েছিল পাঁচ সেন্ট। ক্রমশ যুক্তরাষ্ট্রে জনপ্রিয় হতে শুরু করে এই পানীয়। তখন পেমবারটন দাবি করেন যে, তার উদ্ভাবিত কোকা-কোলা অনেক রোগ সারিয়ে দিতে সক্ষম। ১৮৮৮ সাল নাগাদ কোকা-কোলার তিনটি ভিন্ন স্বাদ বাজারে আনেন পেমবারটন। এভাবে অনেক উত্থান পতনের ভেতর দিয়ে গোটা বিশ্বব্যাপী কোকাকোলা পানীয় হিসেবে জায়গা করে নেয়।
এতো গেল কোকাকোলার উত্থানের কাহিনী। কিন্তু এই কাহিনীর ভেতর লুকিয়ে আছে আরও কিছু সত্যি যা গভীর পর্যবেক্ষণ এবং গবেষণা না করলে জানা সম্ভব হতো না। যুক্তরাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধের অবসান পরবর্তী সময়ে নাগরিক মনস্তত্ব নিয়ে বেশকিছু কার্যক্রম চালু করে দেশটি। এই কার্যক্রমের কিছু অংশ দেশটির স্বাস্থ্য বিভাগ পালন করতো এবং কিছু অংশ পালন করতো সিআইএ। সেই সময় সিআইএ দেশটির তরুন জনগোষ্ঠির ওপর বেশকিছু পরীক্ষা চালায়। সেই পরীক্ষার অংশ হিসেবে তারা তরুণদের মধ্যে সর্বাধিক প্রচলিত পানীয়গুলোতে একটি নির্দিষ্ট মাত্রার কোকেন মেশাতে শুরু করে। উইকিলিকসের ফাঁস করে দেয়া এক প্রতিবেদনে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের তরুণ প্রজন্ম যাতে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে না পারে তাই প্রচুর পরিমানে এলএসডি(মাদক) তরুনদের হাতে তুলে দিতে শুরু করে। তেমনি কোকাকোলার ভেতর কোকেন থাকার কারণে ক্রমশ তরুণদের মধ্যে তন্দ্রাচ্ছন্ন এবং কর্মবিমুখতা বেড়ে যায়। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ধ্বস এবং সামাজিক নেতিবাচক প্রভাবগুলোর দিকে তাকালে আমরা অনেক কিছুই বুঝতে পারি। ক্রমাগত কোকেন হজম করার ফলে নগরস্বাস্থ্যেও এর প্রভাব পরতে থাকে।
২০১২ সালের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০০টির অধিক দেশে প্রায় এক দশমিক আট বিলিয়ন মানুষ নিয়মিত কোকাকোলা খায়। ভোক্তা চাহিদার কথা মাথায় রেখে এখন পর্যন্ত কোকাকোলা বেশ কয়েকবার তাদের পণ্যের গুনগত মান ও বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়া পাল্টেছে। যেমন, ১৯১৬ সালের দিকে কোকোকোলার বোতলকে বলা হতো ক্ল্যাসিক পানীয় বোতল। যাকে ‘হবলস্কার্ট’ নামেও ডাকা হতো। পেমবারটন যে কায়দায় কোকা-কোলায় কোকেন মেশাত ঠিক একই কায়দায় ১৯০৩ সাল অবধি মেশানো হতো। কিন্তু ১৯০৩ সাল নাগাদ প্রতিষ্ঠানটির মালিক পরিবর্তন হলে কোকেন মেশানোতে কিছুটা শিথিলতা আসে। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় আবারও কোকেন মোশানোর মাত্রা বেড়ে যায়। ১৯৪৩ সালের দিকে কোকাকোলা আন্তর্জাতিক ব্রান্ড হিসেবে স্বীকৃতি পায়। সেসময় মার্কিন জেনারেল লাইট ডি. আইসেনহাওয়ার কোকাকোলা কোম্পানিকে প্রতিমাসে তার সেনাবাহিনীর জন্য ছয় মিলিয়ন বোতল কোকাকোলার অর্ডার দেন। এরপর অনেক পথ পাড়ি দিতে হয়েছে কোকাকোলাকে। বর্তমানে, কোকাকোলা কোম্পানি তাদের পানীয়তে ঠিক কি কি উপাদান মেশানো হয় তার জনসম্মুক্ষে প্রকাশ করে না। আর এনিয়ে পানীয়সেবিদের মাঝে রহস্যের অন্ত নেই।

Pages